সায়ন ঘোষ, বনগাঁ : নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁয় জনসভা করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনী প্রচারের ব্যস্ত সূচির মধ্যেই এদিন তিনি একাধিক সভা করার কথা উল্লেখ করে বলেন, "আবহাওয়া অনুকূল না থাকলেও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তাই প্রায় ১ ঘন্টা আগে এসে সভা করতে হচ্ছে।"
এদিন বনগাঁর সভামঞ্চে উঠে প্রথমেই উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর বনগাঁ মহকুমার বনগাঁ উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস, বনগাঁ দক্ষিণের প্রার্থী ঋতুপর্ণা আঢ্য এবং বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী মধুপর্না ঠাকুর কে পাশে নিয়ে তাঁদের হাত তুলে ধরে আগাম জয়ের বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী এবং কর্মী-সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটের লড়াইয়ে নামার আহ্বান জানান। এইভাবেই প্রার্থীদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিয়ে জয়লাভের প্রত্যাশা ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে বনগাঁর জনসভার সূচনা হয়।
এদিনের সভা মঞ্চে তৃণমূল সুপ্রিমোর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রবীণ নেত্রী তথা রাজ্যসভার সংসদ মমতা বালা ঠাকুর সহ বনগাঁ পৌরসভার চেয়ারম্যান দিলিপ মজুমদার, ভাইস চেয়ারম্যান জ্যোৎস্না আঢ্য, প্রাক্তন চেয়ারম্যান শংকর আঢ্য সহ একাধিক কাউন্সিলর।
মঙ্গলবার সভামঞ্চ থেকে বিজেপিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। ঠাকুর পরিবারকে ঘিরে বিভাজনের রাজনীতি করার অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, “যারা বিভেদ তৈরি করে ভোটের রাজনীতি করতে চাইছে, তাদের মুখোশ খুলে দেওয়া হবে।” পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সংস্থার ভূমিকা নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, “তৃণমূল করলে কারণ ছাড়াই ইডি-সিবিআই আসে, আর বিজেপি করলে কিছু হয় না।”
বনগাঁ ও বাগদা অঞ্চলের ভোট প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে ধর্মের নামে বিভাজনের চেষ্টা করে বিজেপি। “আগুন লাগলে দেখে না কার বাড়ি, নদীর ভাঙন সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়”—এই উদাহরণ দিয়ে তিনি ঐক্যের বার্তা দেন। বিজেপিকে নিশানা করে তাঁর মন্তব্য, “ওদের বিশ্বাস করা আর গোখরো সাপকে বিশ্বাস করা একই।”
এদিনের সভায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া ইস্যুতেও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হবে সরকার। একই সঙ্গে স্পষ্ট বার্তা দেন—বাংলায় কোনওভাবেই ডিটেনশন সেন্টার গড়ে তুলতে দেওয়া হবে না। মতুয়া ও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের প্রতি কেন্দ্রের মনোভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
উন্নয়নমূলক প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, যাঁদের এখনও কাঁচা বাড়ি রয়েছে, তাঁদের পাকা বাড়ি করে দেওয়া হবে এবং প্রতিটি বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলবে। ‘দুয়ারে সরকার’-এর সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বুথ স্তরে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ ইতিমধ্যেই হয়েছে এবং কাজ থেমে থাকলেও তা সম্পূর্ণ করা হবে। উন্নয়নের কথা তুলতেই নাম করে বসেন প্রাক্তন বিধায়ক ভূপেন শেঠের। কিন্তু অন্যদিকে প্রাক্তন বিধায়ক ভূপেন শেঠের ছেলে তথা প্রাক্তন চেয়ারম্যান গোপাল শেঠকে দেখতে পাওয়া যায়নি এদিনের সভাতে।
এছাড়া এদিন ‘যুবসাথী’ ও ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর বকেয়া পাওনাদারদের দ্রুত অর্থ প্রদানের আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। ভবিষ্যতে ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ প্রকল্প চালুর কথাও ঘোষণা করেন তিনি, যার মাধ্যমে ব্লক স্তরে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হবে। বনগাঁয় পরিকাঠামো উন্নয়নের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, এলাকায় উন্নত মানের রাস্তা তৈরি হয়েছে মানুষের সুবিধার্থে।
উল্লেখ্য, একই দিনে নদিয়ার রানাঘাট লোকসভা এলাকার চাকদহ, কল্যাণী ও হরিণঘাটা—এই তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রচারসূচি করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সেখানে দলীয় প্রার্থীদের সমর্থনে সভা করে স্থানীয় ইস্যু ও সরকারের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরেছেন তিনি। পাশাপাশি এদিন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গের প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ভোটের নির্ঘণ্ট বেজে গিয়েছে রাজ্য জুড়ে। তাই নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই মানুষের মধ্যে বাড়ছে এক চাপা রাজনৈতিক উত্তেজনা। দিন রাত এক করে রোদ ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে একের পর এক জেলায় প্রার্থীরা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস নাকি বিজেপি কে সরকার গড়বে তা নিয়ে তর্ক বিতর্ক লেগেই রয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে বনগাঁ মহকুমার রাজনৈতিক চিত্র তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে অনুকূল ছিল না। বনগাঁ উত্তর, বনগাঁ দক্ষিণ ও বাগদা—এই তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রেই পরাজয়ের মুখ দেখতে হয় শাসক দলকে। ফলে এই অঞ্চলে সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভোটব্যাঙ্ক পুনরুদ্ধার করা তৃণমূলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মতুয়া অধ্যুষিত এই এলাকায় ভোটের সমীকরণে বড় প্রভাব পড়েছিল, যার জেরে তৎকালীন নির্বাচনে তৃণমূল পিছিয়ে পড়ে। তাই এবারের নির্বাচনে বনগাঁ মহকুমাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দলীয় নেতৃত্ব, এবং ধারাবাহিক প্রচারের মাধ্যমে হারানো জমি ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে তারা।






